আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া: সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফোনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। সেই সুবাদে আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের সূচনা করতে যাচ্ছেন। আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি দেশটিতে অবস্থান করবেন।
তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের মালয়েশিয়া সফর হওয়ায় প্রবাসীরা এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আশা করছেন, এই সফরে শ্রমবাজার, কলিং ভিসা, অবৈধ কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসীদের কল্যাণ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পাবে।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা চালু করা। তাঁরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে কর্মীরা অতিরিক্ত খরচে মালয়েশিয়ায় আসতে বাধ্য হয়েছেন।
কুয়ালালামপুরে কর্মরত প্রবাসী আলি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সরকার যদি সরাসরি এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করে, তাহলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে বিদেশে আসার সুযোগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে আমরা এই বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি। আরেক প্রবাসী নুর বলেন, কলিং ভিসা চালু থাকলেও যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না। তাই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করছেন। কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থান সংকটের কারণে অনিয়মিত অবস্থায় চলে গেছেন। সেলাঙ্গরে বসবাসরত এক প্রবাসী শ্রমিক বলেন, আমরা অনেকেই বছরের পর বছর এখানে কাজ করছি। সুযোগ পেলে বৈধ হওয়ার মাধ্যমে দেশের জন্য আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে আলোচনা হলে হাজারো পরিবার উপকৃত হবে।
প্রবাসীদের মতে, মালয়েশিয়া সরকার অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বৈধকরণ কর্মসূচি চালু করেছে। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে নতুন কোনো বৈধতা কর্মসূচি চালু হলে অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য তা আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি নিয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ইউনিভার্সিটি মালায় অধ্যয়নরত এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, মালয়েশিয়া এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। আমরা চাই দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা আরও জোরদার হোক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভিসা, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ ও একাডেমিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক হবে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে আশাবাদী। তাদের মতে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কুয়ালালামপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমরা চাই এই সফরের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, প্রযুক্তি ও কৃষিভিত্তিক খাতে সহযোগিতা বাড়ুক। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সুবিধা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং যৌথ উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি হলে দুই দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
প্রবাসীরা মনে করেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা সমাধানে দূতাবাসের সেবার মান আরও উন্নত করা প্রয়োজন। পাসপোর্ট নবায়ন, শ্রমিক অধিকার, আইনি সহায়তা এবং জরুরি সেবার ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রবাসী নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি হতে পারে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা চালু, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার সুযোগ এবং প্রবাসীবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। তাই সফরকে ঘিরে প্রবাসী সমাজের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। তাঁরা আশা করছেন, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং প্রবাসীদের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে।
ব্রেকিং নিউজ, এই মুহূর্তের খবর, প্রতিদিনের সর্বশেষ খবর, লেটেস্ট নিউজ এবং গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিউজ পেতে ভিজিট করুন www.bangladeshglobal.com