ঢাকা      শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

ধর্ষণের প্রতিবাদে গর্জে উঠা বাংলাদেশ

IMG
19 October 2020, 1:02 AM

স্বপ্না চক্রবর্তী: সিলেটের এমসি কলেজ থেকে শুরু করে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ। ধর্ষকদের থাবায় যখন পুরো দেশ ক্ষতবিক্ষত, তখনই রাস্তায় নামতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষ। ধর্ষণের প্রতিবাদ এবং ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে রাজপথ। এ অবস্থায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর নির্দেশ দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত ৪ অক্টোবর নোয়াখালীতে এক গৃহবধূকে দুর্বৃত্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিবস্ত্র করে মুখমন্ডলে লাথি মারাসহ মারধরের ভিডিও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ওই দিনই আবদুর রহিম (২২) নামে এক যুবককে আটক করে বেগমগঞ্জ থানা পুলিশ। এক দিনের মাথায় আটক হয় অভিযুক্ত প্রায় সব আসামীই। একই রকমভাবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বর্বরতার শিকার হন সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সাথে ঘুরতেযাওয়া এক নববধুও। ২৭ সেপ্টেম্বর খেয়াঘাট থেকে গণধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর গ্রেফতার হন। এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অন্য আসামীরা হলেন: সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫)। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব আসামীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীসহ দেশবাসী।

এর ঠিক ক’দিন আগে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্বামীর জন্য রক্ত যোগাড় করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন আরেক নারী। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষক ও তার সহযোগীকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করে র‌্যাব-২। দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন দু’জন। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে নাটোরে। জন্মদাতা বাবা কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয় মেয়ে। অত্যান্ত সুকৌশলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ওই ভন্ড বাবাকে আটক করলেও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অনুভুতিকে নাড়িয়ে দেয় ঘটনাটি।

তবে শুধু নোয়াখালী, সিলেট বা নাটোরই নয়; সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় নাড়া দিয়েছে পুরো জাতির বিবেককে। ধর্ষণের প্রতিবাদে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও নারী অধিকার কর্মীরা। তারা যত দ্রুততম সময়ে আসামীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, ঠিক ততটাই দ্রুততম সময়ে সঠিক বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দাবির প্রেক্ষিতেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিমৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০০’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়।

সেই অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ১৩ অক্টোবর। জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে এটি আইন আকারে পাস হবে।এর আগে, ১২ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিমৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০০’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

জানা যায়, আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার পাশাপাশি আরও দু’টি সংশোধনী আনা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো যৌতুকের ঘটনায় মারধরের ক্ষেত্রে (ধারা ১১-এর গ) সাধারণ জখম হলে তা আপোসযোগ্য হবে। এছাড়া এই আইনের চিলড্রেন অ্যাক্ট-১৯৭৪-এর (ধারা ২০-এর ৭) পরিবর্তে শিশু আইন-২০১৩ প্রতিস্থাপিত হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯-২০২০ সালে দেশে ধর্ষণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৬ সালে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭২৪টি, ২০১৭ সালে ৮১৮, ২০১৮ সালে ৭৩২, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা পাওয়া যায় ৯৭৫টি। অর্থাৎ ২০১৯ ও ২০২০ সালে গড়ে প্রতিদিন ৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যেখানে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল দু’জন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে ধর্ষণের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চ মাসে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা ছিল বছরের সর্বনিম্ন। এই মাসে ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনা পাওয়া যায়। এরপর প্রতি মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এপ্রিল মাসে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭৬, মে মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ তে। জুনে ধর্ষণের পরিমাণ মারাত্মক হারে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৬-এ। যা মার্চ মাসের সংখ্যার থেকে প্রায় তিন গুণ বেশি। এরপর জুলাই ও আগস্ট মাসেও এই বৃদ্ধি জারি থাকে। জুলাই ও আগস্ট মাসে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪০টি ও ১৪৮টি। সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৮৬টি। এই হ্রাসের কারণ হিসেবে আন্দোলন ও পুলিশি তৎপরতা একটি প্রভাবক হতে পারে।২০১৯ সালের মাসওয়ারি বিশ্লেষণেও একই প্যাটার্ন দেখা যায়। বছরের শুরুতে ধর্ষণের সংখ্যা কম থাকে। কিন্তু এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা বেশি পাওয়া যায়।

১৮ বছরের নিচে ধর্ষণের সংখ্যা বেশি কেন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বয়সী কিশোরীদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকে না। তাদের নির্যাতনকারী নানা রকমের কথা দিয়ে, সম্পর্ক স্থাপন করে বশে আনতে পারে। কারণ কিশোর বয়সে বয়ঃসন্ধিকালে বাড়তি আবেগ ও কম যুক্তি কাজ করে।

এছাড়া কোন একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে কিশোরীরা কারোর সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না। তবে এর চেয়েও কমবয়সীদের ধর্ষণ সংখ্যা বেশি দেখা যায়। কারণ শিশুদের পরিবারের কাছের মানুষরা নির্যাতন করে বেশি। শিশুদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা যায়। ১৮ বছরের ওপরের ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারীর বাধা দেয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়, অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পারে।

২০১৯ সালে এই সময়কালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক হাজার ১১৫ জন। আর এ বছর একই সময়কালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন নারী।২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ সংখ্যা প্রতি বছরই দুই-একটি ঘটনা আলোচিত হলেও এবারই প্রথম ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার বিষয়ে জোরালো দাবি উঠলে গত ১৩ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনী এনে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে জারি করে সরকার।

২০০০ সালের ৮ নম্বর আইনের ধারা ৯ সংশোধনের জন্য জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। আগের আইনে ‘অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষার কথা বলা ছিল। অধ্যাদেশে ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষা’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।এছাড়াও ‘অপরাধের শিকার ব্যক্তির’ কথা বলা ছিল। অধ্যাদেশে ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।

অধ্যাদেশে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড) পরীক্ষার বিষয়ে বলা হয়েছে: এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা-৩২-এর অধীন মেডিকেল পরীক্ষা ছাড়াও উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন, ২০১৪ (২০১৪ সালের ১০ নং আইন)-এর বিধান অনুযায়ী ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।

আইনের ধারা ৯ (১) এ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রতিস্থাপিত হবে। আইনের ১১ (গ) এবং ২০ (৭) ধারা সংশোধন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ষণ ছাড়া সাধারণ জখম হলে কম্পাউন্ড (আপসযোগ্য) করা যাবে। আর চিলড্রেন অ্যাক্ট, ১৯৭৪ প্রযোজ্য হবে না। এখন শিশু আইন, ২০১৩ প্রযোজ্য হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ইস্যুতে সরকারের এমন তড়িৎ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এবার অন্তত মেয়েরা নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পাবে। হায়েনার লোলুপ দৃষ্টিতে আর তাদের ধর্ষণের শিকার হতে হবে না।

লেখক: স্বপ্না চক্রবর্তী, সাংবাদিক

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন