ঢাকা      শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে আমাদের সচেতনতা

IMG
16 November 2020, 4:57 PM

ডা: শরীফ মো. রুহুল কুদ্দুস: নভেম্বর মাস থেকে আমাদের দেশে শীতের আমেজ অনুভূত হয়। এ সময় থেকেই ঠান্ডাজণিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। ঋতু পরিবর্তনজনিত কারণে দিনে গরম এবং রাতে ঠা-া থাকায় শিশু এবং বয়স্করা বেশি ঠা-াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে সাদিয়া ইসলাম তার পনেরো দিন বয়সী শিশুকে নিয়ে আসেন ঢাকার মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। শিশুটির পাঁচদিন যাবত জ্বর এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর শিশুটি সুস্থ হয়। এ হাসপাতালের চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবা নিয়ে শিশুটি সুস্থ হওয়ায় মা সাদিয়া খুব খুশি। হাসপাতাল ত্যাগের সময় শিশুকে সময়মতো সবগুলো টিকা দেয়া, ছয়মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং শিশুর কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নেয়া ইত্যাদি পরামর্শ ডাক্তার দিয়েছেন শিশুটির মাকে।

মানবদেহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হচ্ছে ফুসফুস। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করি ফুসফুসের সাহায্যে। নিউমোনিয়া ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এ রোগের প্রধান কারণ- ঠান্ডা, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ভাইরাস। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুসে পুঁজ ও তরলজাতীয় পদার্থ জমে তাদের শ্বাস নিতে বাধা দেয়। সব সর্দি-কাশিই নিউমোনিয়া নয়। জ্বর এর কফ ও শ্বাসকষ্ট থাকলে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ হয়েছে বলে ধরা হয়। শীতে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এই নিউমোনিয়া। যেসব শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে তারা নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য একটি মারাত্মক প্রাণঘাতি রোগ। নিউমোনিয়াকে বলা হয় শিশুমৃত্যুর নীরব ঘাতক। এ রোগ সম্পর্কে আমাদের এখনো সচেতনতা কম। নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু রোধে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটে নিউমোনিয়ায়।

ইউনিসেফের নভেম্বর, ২০১৯ তারিখের জরিপ অনুসারে, বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৮ লাখেরও বেশি শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। অর্থাৎ প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। দুই বছরের কম বয়সী যত শিশু মারা যায় তার বেশিরভাগই জন্মের প্রথম মাসেই মৃত্যু হয়। সেভ দ্যা চিলড্রেন এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে নিউমোনিয়ার কারণে বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় দু’জন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, যা বছরে প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার। তবে দেশে গত বিশ বছরে শিশু মৃত্যুর হার ৬৩ শতাংশ কমেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০০০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ শিশু মৃত্যু হ্রাসে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। শিশু মৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ অন্যতম।

নিউমোনিয়ার উপসর্গসমূহের মধ্যে রয়েছে; স্বাভাবিকের চেয়ে শিশুর ঘন ঘন শ্বাস নেয়া, শ্বাস নেয়ার সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, শ্বাস নেয়ার সময় বাঁশির মত সাঁই সাঁই আওয়াজ হওয়া, কণ্ঠ পরিবর্তন হওয়া, কাশি বেশি হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া ও খিঁচুনি হওয়া। শূন্য থেকে ২ মাস বয়সের শিশু প্রতি মিনিটে ৬০ বা তার চেয়ে বেশিবার শ্বাস নেয়া, ২ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুর প্রতি মিনিটে ৫০ বা তার চেয়ে বেশি শ্বাস নেয়া এবং ১২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু প্রতি মিনিটে ৪০ বা তার চেয়ে বেশিবার শ্বাস নেয়াকে অস্বাভাবিক অবস্থাকে বুঝায়। এ জাতীয় লক্ষণ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

পুষ্টিহীনতাও শিশুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং প্রতিটি শিশুকে জন্মের প্রথম ঘন্টায় মায়ের বুকের শালদুধ খেতে দিতে হবে। এতে নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত অনেক রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শীত বেশি থাকে বলে এ সময় নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হয়। তবে বছরের অন্যান্য সময়েও শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।

নিউমোনিয়া রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে, শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি অর্ধেক কমানো সম্ভব। নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে যদি বাবা-মার ধারণা থাকে এবং সে অনুসারে চিকিৎসকের কাছে নেয়া হয় তাহলে শিশুকে সহজেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর হারও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব।

সাধারণ নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বাড়িতেই সম্ভব। এ জন্য সঠিক ওষুধের পাশাপাশি এ সময় তরল খাবার খেতে হবে এবং পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে। শিশুর বয়স ২ বছরের কম হলে মায়ের বুকের দুধ অবশ্যই অন্যান্য খাবারের সাথে খাওয়াতে হবে। এ সময় কুসুম গরম পানি, লবণ-পানি বা লাল চা খাওয়া যেতে পারে। শিশুদের তুলসি পাতার রস মধু দিয়ে এবং কুসুম গরম পানিতে লেবু মধুর শরবত দিতে হবে। নাকে নরমাল স্যালাইন, নরসল ড্রপ দেওয়া যেতে পারে। শিশুর বুকে তেল বা কোনো মালিশ ব্যবহার করাও উচিত নয়। শিশুদের সামান্য কাশিতে অহেতুক নেবুলাইজার যন্ত্র ব্যবহারও ঠিক নয়। নিউমোনিয়া ভালো হতে অনেক সময় দুই তিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। শিশুর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে, খুব বেশি শ্বাসকষ্ট, বমি হলে, শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে বা খিঁচুনি হলে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

নিউমোনিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সচেতন হলে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। নিউমোনিয়াসহ অন্য রোগের ভ্যাকসিন নিতে হবে বিশেষ করে ৫ বছরের নিচে বা ৬৫ বছরের ওপরে বয়সীদের অথবা যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। ধূমপান ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সহজেই সংক্রমণ ঘটতে পারে এবং নিউমোনিয়া হতে পারে। শিশুকে চুলার ধোঁয়া, মশার কয়েল ও সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখাও জরুরি। সাধারণ ঠান্ডা লাগলেও খেয়াল রাখতে হবে যেন এটি খারাপ দিকে না যায়। স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, পরিমিত বিশ্রাম নিতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শিশু জন্মের পর ইপিআই টিকাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এখন সরকারি হাসপাতালে নিউমোনিয়ার টিকা দেয়া হচ্ছে।

শিশু এবং মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০১০ সালে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার হ্রাস এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এমডিজি এ্যায়ার্ড ২০১০ প্রদান করে। সম্প্রসারিত টিকাদান (ইপিআই) কার্যক্রমের আওতায় শতকরা ৮৭ ভাগের বেশি শিশুকে আনা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভ্যাকসিন দশক ধরা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভ্যাকসিন হিরো প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে টিকাদানের সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার দিয়েছে গ্লেবাল অ্যালয়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)।

জাতীয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২’-এর বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র স্বাস্থ্যবিষয়ক সূচকগুলো অর্জনে এ উন্নয়ন কর্মসূচি বিরাট ভূমিকা রাখবে।

গ্রামীণ স্বাস্থসেবায় বড় ভূমিকা রাখছে দেশের কমিউনিটি ক্লিনিক। কমিউনিটি ক্লিনিক দেশের সকল জনগণের দোড় গোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ঔষধ হাজার হাজার মা ও শিশুর জীবন বাঁচাচ্ছে।

মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এখন মানুষের হাতের নাগালেই। তাই নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সকলকে সচেতন হতে হবে। শিশুর হঠাৎ কোনো সমস্যা হলে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে জরুরি সেবা পাওয়া যাবে। নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে গণমাধ্যমে বেশি করে প্রচার করতে হবে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এ রোগ সম্পর্কে সচেতন হবে এবং নিউমোনিয়া প্রতিরোধ আরো সহজ হবে।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন