ঢাকা      সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

'ঘর বাঁধলেন শতবর্ষী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা'

IMG
23 February 2021, 4:41 PM

সাহেব আলী, দিনাজপুর, বাংলাদেশ গ্লোবাল : “যদিদং হৃদয়ং মম-তদিদং হৃদয়ং তব”- বিবাহবাসরে সনাতনী এই বেদমন্ত্র দিয়ে বরাবরই হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুনীরা বিয়ে সম্পন্ন করলেও এবার এই বেদমন্ত্র পড়ে আবারও বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন শতবর্ষী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। বরের বয়স শতবর্ষ ও কনের বয়স শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই।

এরপরও এই পুনঃবিয়ের আয়োজনের ছিলো না কোন কমতি। বিবাহ বাসরে ব্রাক্ষ্মন দিয়ে বিয়ে শুধুমাত্র সনাতনী এই বেদমন্ত্র দিয়েই নয়, নাচ-গান, বাদ্য-বাজনা আর সনাতন রীতিতে ধুমধামের সাথে সম্পন্ন হয়েছে এই বিয়ে। বিয়ের নিমন্ত্রণ কার্ড থেকে শুরু করে সহস্রাধিক মানুষের তিন দিন ধরে ভোজনের আয়োজন।


দিনাজপুরের বিরল উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম দক্ষিন মেড়াগাঁও-এ ৮ ফাল্গুন রোজ রোববার ধুমধামের সাথে সম্পন্ন হয়েছে বিরল এই বিয়ে।


বর দক্ষিন মেড়াগাঁও গ্রামের স্বর্গীয় ভেলগু দেবশর্মার পুত্র বৈদ্যনাথ দেবশর্মা। আর কনে তারই ৯০ বছর আগে বিয়ে করা স্ত্রী পঞ্চবালা দেবশর্মা।

বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে তিনি উল্লেখ করেন “পরম করুনাময় ইশ্বরের অশেষ কৃপায় আমার বয়স ১০৭ বছর। আমার স্ত্রী শ্রীমতি পঞ্চ বালা-এর সহিত প্রায় ৯০ বছর পুর্বে বিবাহ সু-সম্পন্ন হয়। আমদের বিবাহের পঞ্চম পীড়ি (পাঁচ পাচ প্রজন্ম) উত্তীর্ণ হওয়ায় ৮ই ফাল্গুন রোজ রবিবার এক সনাতনী বেদমন্ত্র উচ্চারনে “যদিদং হৃদয়ং মম-তদিদং হৃদয়ং তব” পুনঃবিবাহ মিলনের অনুষ্ঠান সু-সম্পন্ন হইবে। উক্ত পুনঃ বিবাহ মিলন ও প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে আমার নিজ বাসভবনে উপস্থিত থাকার বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম। ত্রুটি মার্জনীয়।” নিমন্ত্রণপত্রে বিয়ের লগ্নতিথি, বৌভাতসহ সব অনুষ্ঠানের সময়সুচী উল্লেখ করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, পাঁচ শতাধিক কার্ড ছাপিয়ে বিয়ের নিমন্ত্রণ দেয়া হয় আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীকে।

দক্ষিন মেড়াগাঁও-এ প্রায় মাস খানেক ধরেই আয়োজন চলে শতবর্ষী এই বর কনের বিয়ের। এই আয়োজনের পর রোববার রাত ৮টায় বর আসেন গাড়ীতে চরে। যথারীতি পুজাপার্বনের মাধ্যমে বরকে বরণ করে নিয়ে বসানো হয় বিবাহ বাসরে এবং সাজিয়ে-গুজিয়ে তার পাশেই বসানো হয় কনেকে। এরপর ব্রাক্ষ্মন নিয়ে উচ্চারন করা হয় সনাতনী বেদমন্ত্র “যদিদং হৃদয়ং মম-তদিদং হৃদয়ং তব”। এভাবেই সনাতনী রীতিতে মালাবদলসহ সবরকম আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ে।

বিয়ের আসরে ধান-দুর্বা, গরু, বিভিন্ন উপঢৌকন দিনে দম্পত্তিকে আশির্বাদ করেন নিমন্ত্রিত অতিথিরা। ধর্মীয় রীতির পাশাপাশি ধুমধামের কোন কমতি ছিলো না বিয়েতে। ছিলো বাদ্য-বাজনা, নাচগান, সহস্রাধিক মানুষের প্রীতিভোজসহ সব আয়োজনের। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, জনপ্রতিনিধিসহ সহস্রাধিক মানুষ। বিয়েতে নিমন্ত্রিত অতিথিরা মোট ১৩টি গরু ও অসংখ্য উপহার সামগ্রী আশির্বাদ হিসেবে দিয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবারের সদস্যরা।

বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া বৈদ্যনাথ তার বিয়ের কার্ডে বয়স ১০৭ উল্লেখ করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স ৯২ বছর। এ বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বয়স ভুল আছে। তার পিতা স্বর্গীয় ভেলগু দেবশর্মার হাতে লিখে যাওয়া জন্মতারিখ অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ১০৭ বছর। তিনি বলেন, বিয়ের পঞ্চম পীড়ি অর্থ্যাৎ পঞ্চম প্রজন্ম পার হয়েছে। এ জন্যই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী আবার এই বিয়ে। বংশধরদের মঙ্গলের জন্যই এই বিয়ের আয়োজন বলে জানান তিনি।

বিয়ের পিড়িতে বসে বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া কনে পঞ্চ বালা দেবশর্মা জানালেন, ছোটবেলা বিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় বিয়ে কি- তা তিনি বুঝেননি। কিন্তু এবার এই বিয়েতে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন তিনি। আমাদের বংশধররাও যাতে আমাদের মতো দীর্ঘজীবি হয়-এ জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছি।

রোববার রাতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বেদমন্ত্র দিয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন ব্রাক্ষ্মন মহাদেব ভট্টাচার্য্য। তিনি জানান, এর আগে এমন বিয়ে তিনি কখনই দেননি এবং দেখেননি। এরকম বিয়েতে পুরোহিতের কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন তিনি।

বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওই এলাকার হিন্দু বিবাহ রেজিষ্ট্রার বিভুতি ভুষন সরকার। তিনিও জানান, এর আগে তার এলাকায় এরকম নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়নি। হয়তো বাংলাদেশে এই বয়সের মানুষের বিয়ের অনুষ্ঠান এটিই প্রথম বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বিরল উপজেলায় এটি একটি বিরল ঘটনা।

বৈদ্যনাথ দেবশর্মার একমাত্র মেয়ে বৃদ্ধা ঝিনকো বালা দেবশর্মা জানান, তার পিতার মাতার একমাত্র সন্তান তিনি। তারই নাতী-নাতনী আবার তাদের সন্তান ও নাতী-নাতনীসহ মোট ৪টি প্রজন্ম পার করছেন। আর তার বাবা-মা পার করছেন পাঁচটি প্রজন্ম। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ভবিষ্যৎ বংশধরদের কল্যানেই এই বিয়ের আয়োজন করেছেন তারা। আর এই বিয়ের আয়োজন করতে পেরে পরিবারের সদস্যরা সকলেই খুশী ও আনন্দিত। তাই তারা বিয়ে অনুষ্ঠানের কোন কমতি রাখেন নাই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তার বংশধররাও যাতে বাবা-মায়ের মতো দীর্ঘজীবি হয়।

পাড়া প্রতিবেশী আর আত্মীয় স্বজনদের পাশাপাশি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও। বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে স্থানীয় ৮ নং ধর্মপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাবুল চন্দ্র সরকার জানান, ধুমধামের সাথে ব্যাতিক্রমী এই বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এরকম বিয়ে তারা কখনও দেখেননি। এমন বিয়ের অনুষ্ঠানে আসতে পেরে খুশী তারা।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন