ঢাকা      রবিবার, ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
IMG-LOGO
শিরোনাম

‘খুনের পর নিখোঁজের নাটক সাজান শিমুর স্বামী’

IMG
19 January 2022, 11:07 AM

ঢাকা, বাংলাদেশ গ্লোবাল: খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু। কিন্তু ক্ষোভের আগুনে দেড় যুগের সেই ভালোবাসা টেকেনি। গত রোববার সকাল সোয়া ৭টার দিকে দাম্পত্য কলহের জেরে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে শিমুকে হত্যা করেন তারই ‘ভালোবাসার মানুষ’ নোবেল। এর পর বাল্যবন্ধু আবদুল্লাহ ফরহাদের সহায়তায় লাশ বস্তায় ভরে কেরানীগঞ্জের হজরত পুর ইউনিয়নে নেন। সেখানে আলীপুর ব্রিজ থেকে ৩০০ গজ উত্তরে রাস্তার পাশে ঝোপের ভেতর মরদেহটি ফেলে পরে থানায় জিডি করে ‘নিখোঁজ’ নাটক সাজান নোবেল।

পুলিশ জানিয়েছে, শিমুর মরদেহ উদ্ধারের খবর চাওর হলেও ভড়কে যাননি নোবেল ও তার বন্ধু। সোমবার রাতে শিমুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিটফোর্ড মর্গে গিয়ে দুই বন্ধু নিহতের দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বিমর্ষতার ভান করেন। রাতেই সন্দেহভাজন হিসেবে র‌্যাবের হাতে আটক হন দুজন। এর পর হত্যার দায় স্বীকার করে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তাদের নিয়ে অভিযান চালিয়ে মরদেহ গুমে ব্যবহার করা গাড়িটিও জব্দ করে পুলিশ।

গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে রাজধানীর গ্রিন রোডের বাসায় থাকতেন ৪০ বছর বয়সী শিমু। রোববার সকালে কলাবাগানের বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি তিনি। তার সন্ধানে সোমবার কলাবাগান থানায় জিডি করেন নোবেল। এর মধ্যে সোমবার দুপুরে স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ব্রিজের কাছে আলিয়াপুর এলাকায় রাস্তার পাশে বস্তা থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে অভিযুক্ত দুই বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, পারিবারিক বিষয়াদি ও দাম্পত্য কলহের কারণে রোববার সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে কোনো একসময় শিমুকে হত্যা করেন নোবেল। আর মরদেহটি গুম করতে সহায়তা করেন নোবেলের বন্ধু ফরহাদ।

এদিকে চিত্রনায়িকা ও মডেল শিমু হত্যার ঘটনায় করা মামলায় নোবেল ও আবদুল্লাহ ফরহাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাবেয়া বেগম রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

এর আগে নিহত শিমুর বড় ভাই হারুন অর রশিদ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে শিমুর স্বামী নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু ফরহাদ এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানার এসআই চুন্নু মিয়া।

পুলিশ সূত্র জানায়, শিমুর মরদেহ উদ্ধারের পর তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে নিহত নারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এর পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি অভিনেত্রী শিমুর বাসায় গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এ সময় একটি প্লাস্টিকের সুতার সূত্র ধরে উদ্ঘাটন করা হয় হত্যার মূল রহস্য। মরদেহ গুম করতে বস্তা যে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল, সেই সুতারই হুবহু এক বান্ডিল শিমুর স্বামীর গাড়িতে পাওয়া যায়। দুর্গন্ধ দূর করতে গাড়িটি ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধোয়া হয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে নোবেল জানান, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি শিমুকে হত্যা করেছেন। গত রোববার সকাল ৭টা-৮টার দিকে তিনি শিমুকে গলাটিপে হত্যা করেন। এর পর ফরহাদকে মুঠোফোনে কল করে ডেকে নেন। পরে ফরহাদ ও নোবেল পরিকল্পনা করে বাইরে থেকে বস্তা এনে শিমুর লাশ লম্বালম্বিভাবে দুটি পাটের বস্তায় ভরে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করেন। এর পর বাড়ির দারোয়ানকে নাশতা আনতে বাইরে পাঠিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গাড়ির পেছনের আসনে শিমুর লাশ নিয়ে বেরিয়ে যান। লাশ গুমের উদ্দেশ্যে প্রথমে গন্তব্য ছিল গাজীপুরের দিকে। ওই রাস্তায় পুলিশের তল্লাশিচৌকি বেশি থাকায় উল্টো পথ ধরে কেরানীগঞ্জের আলিয়াপুর ব্রিজের পার্শ¦বর্তী সড়কে দাঁড়িয়ে উপায় খুঁজতে থাকেন। মানুষের আনাগোনা থাকায় প্রায় আধাঘণ্টা লাশভর্তি প্রাইভেটকারে হেলান দিয়ে সিগারেট ফুকেন দুই বন্ধু। একপর্যায়ে এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে এলে ঠান্ডা মাথায় ওই ব্রিজের অদূরেই একটি ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে রেখে ঢাকায় চলে আসেন তারা। এর পর হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে রোববার রাতেই রাজধানীর কলাবাগান থানায় একটি জিডি করেন নোবেল। জিডিতে উল্লেখ করেন, শিমু মাওয়ায় শুটিংয়ের কথা বলে রোববার সকাল ১০টার দিকে কলাবাগানের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার জানান, গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে সংবাদ পেয়ে স্থানীয় পুলিশ আলীপুর ব্রিজ থেকে প্রায় ৩০০ গজ উত্তর পাশে পাকা রাস্তাসংলগ্ন ঝোপের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় অচেনা হিসেবে শিমুর মরদেহ উদ্ধার করে। দেহটি দুটি বস্তায় ভরা ছিল। একটি পাটের বস্তা পায়ের দিক থেকে; আরেকটি মাথার দিক থেকে ঢুকিয়ে মাঝ বরাবর সেলাই করা হয়েছিল। হত্যাকারীরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামত রেখে যায়। সেসব আলামত জব্দের পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিমুর স্বামী এবং তার বাল্যবন্ধুকে সোমবার রাতে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় আনা হয়। তথ্যপ্রমাণ ও তাদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যাকান্ডে শিমুর স্বামী ও তার বন্ধুর সরাসরি সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।

অন্যদিকে শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল বলে ময়নাতদন্তেও প্রমাণ পেয়েছেন চিকিৎসক। গতকাল দুপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলেন, নিহতের গলায় স্পষ্ট কালো দাগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে রশি বা কোনো কিছু দিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ভিসেরা (অভ্যন্তরীণ কিছু অঙ্গ) সংগ্রহ করা হয়েছে।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মো. আবু সালাম মিয়া জানান, নোবেল ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার কমলাপুর গ্রামের খন্দকার আলিমুজ্জামানের ছেলে। শিমু পিরোজপুর জেলার সদর থানার সিআইপাড়ার নুরুল ইসলামের মেয়ে। শিমুকে হত্যা করার কথা প্রাথমিকভাবে তার স্বামী স্বীকার করেছেন।

শিমুকে যে এভাবে মেরে ফেলা হবে, ভাবতেই পারছেন না তার ছোট বোন ফাতিমা নিশা। কেননা ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে স্বামীর হাতে এমন নৃশংসভাবে খুন হতে হবে শিমুকে। মঙ্গলবার দুপুরে হত্যাকান্ডের আগের দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘রেববার সন্ধ্যায় আমার কাছে একটি ফোন আসে যে, শিমুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। তখন থেকেই শিমুর ফোনে বারবার কল দিই। নম্বর বন্ধ পাচ্ছিলাম। পরে আমি আমার বোনের মেয়েকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি তোমার আম্মু কোথায়? সে আমাকে বলে, মা সকালে একা বের হয়েছে এখনো বাসায় ফেরেননি। তার পর আমি নোবেল ভাইকে ফোন দিই। তাকে ফোন দিয়ে বলি ভাইয়া আপু কোথায়? তার ফোন তো বন্ধ পাচ্ছি। তখন তিনি বলেন, আমি তো বিষয়টি জানি না। সারাদিনে আমি তাকে ফোন দিইনি। তার নাম্বার যে বন্ধ সেটিও আমি জানি না। পর দিনই (সোমবার) শিমুর মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারি। আমার বোনকে হত্যা করে এভাবে বস্তাবন্দি অবস্থায় ফেলে রেখে যাবে এটি ভাবতেই পারছি না।’

মঙ্গলবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা জেলা ইউনিটের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, অজ্ঞাত হিসেবে মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টার জন্য পিবিআইকে খবর দেওয়া হয়। এর পর পিবিআই কর্মকর্তারা মরদেহের আঙুলের ছাপ নেন। এর পর তার নাম-পরিচয়, বয়স ও বাসার ঠিকানা শনাক্ত করে পিবিআই।

নিহত শিমুর বড় ভাই শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘নোবেল মাদকাসক্ত। শিমুর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া করত। হত্যার পর নোবেলের গাড়িতে রক্ত পাওয়া গেছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সে বাসায় ছিল না; সেই সময়ের মধ্যে মরদেহ গাড়িতে করে নিয়ে ফেলে দিয়েছে। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।’

বাংলাদেশ গ্লোবাল/এইচএম

সবশেষ খবর এবং আপডেট জানার জন্য চোখ রাখুন বাংলাদেশ গ্লোবাল ডট কম-এ। ব্রেকিং নিউজ এবং দিনের আলোচিত সংবাদ জানতে লগ ইন করুন: www.bangladeshglobal.com

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন