ঢাকা      বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
IMG-LOGO
শিরোনাম

করতোয়ার নৌকাডুবি: পূজার আনন্দ রূপ নিলো বিষাদে

IMG
28 September 2022, 5:15 PM

রেজওয়ান রনি,পঞ্চগড় থেকে: কয়েকদিন পরে শুরু হচ্ছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দূর্গা পূজা। পূজা শুরুর প্রাক্কালে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানাতে মহালয়ার দিন পঞ্চগড়ের বোদার বটেশ্বরী মন্দিরে দূর্গার আবাহন উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বিশাল অনুষ্ঠান। এতে যোগ দিতে কয়েক উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জড়ো হন আউলিয়ার ঘাটে। নতুন পোশাক আর রঙিন সাজ নিয়ে শতাধিক মানুষ ওঠেন নৌকায়। কিন্ত মাঝনদীতে গিয়ে ডুবে যায় নৌকাটি। নৌকাডুবিতে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৬৮ জনের লাশ।

এমন ভয়াবহ দূর্ঘটনায় শোকে স্তব্ধ করতোয়া তীর। ইতিহাসের ভয়াবহ এমন দূর্ঘটনার সাক্ষী উত্তরের এই জনপদ। নিহিতদের হিন্দুপল্লীগুলোতে চলছে শোকের মাতম। শোকে ম্লান জেলার ২৯৫ টি পুজামন্দিরের শারদীয় দুর্গোৎসব।

পূজোর আগের মুহূর্তে কেনাকাটা,হৈ-হুল্লোড় এবং পূজা মণ্ডপ তৈরির পরিবর্তে তারা এখন স্বজন আর প্রতিবেশীদের লাশ সৎকারে ব্যস্ত । নিখোঁজদের খুঁজতে এদিক সেদিক স্বজনদের দৌড়াদৌড়ি। স্বজন ও প্রতিবেশিদের এমন করুন বিদায়ে বিষাদে ছেয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম,ফিকে হয়ে গিয়েছে উৎসবের রং। এত বড় দূর্ঘটনায় শোক ছড়িয়েছে গোটা দেশে।

চোখ বুজলেই ভেসে আসছে বাবা ও দু'বোনের চেহারা। মহালয়ার দিন ভয়াবহ নৌকাডুবিতে সবাই ডুবে গেছে।তাদের সাথে থাকা দুলাভাই আর বেয়াইয়ের একই পরিণতি হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনের লাশ উদ্ধার হলেও এখনো বাবাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে খুঁজতে করতোয়া তীরে এ ঘাট থেকে ও ঘাট ছুটছে সাকোয়া কলেজ পাড়ার স্বপন রায়। তিনি জানালেন ,স্বজনদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের বাকী সদস্যরাও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছেন।

সাকোয়া কলেজপাড়ার বাসিন্দা মিঠুন জানান, হিন্দুগ্রামগুলোতে এমন কোন পরিবার পাওয়া যাবেনা যাদের আপনজন এ দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে মারা যাননি। স্বজনদের লাশ দাহের পর মনে কি আর কোনো আনন্দ থাকে এমন প্রশ্ন করেন তিনি।

শারদীয় দূর্গাপূজায় ঢাকে-ঢোলে দেবীদূর্গাকে বরনের মুহুর্তে গ্রামে গ্রামে জ্বলছে স্বজন ও প্রতিবেশীদের পোড়ানোর চিতা । কোন কোন পরিবারের একইসাথে ৩-৪ জনকে হারিয়েছেন। চারদিন থেকে নিহতদের বাড়ীতে চুলো জ্বলছেনা । শোকার্ত মানুষগুলোর হৃদয়ে যে বিষাদ তা ঢেকে দিয়েছে পুজার আনন্দ।প্রিয়জন হারানোর ব্যথা আর যন্ত্রনায় ম্লান এবারের পূজা উৎসব।

স্থানীয় বাসিন্দা প্রদীপ জানায়, এই উৎসবে আমাদের আনন্দের সীমা থাকেনা। কিন্ত এতগুলো মানুষকে হারিয়ে এই উৎসবে কিভাবে আনন্দ করব।

নিজের চোখের সামনে লোকবোঝাই নৌকাটিকে ডুবতে দেখেছেন ঘটনাস্থলের পাশের চা বাগানের ম্যানেজার প্রহ্লাদ চন্দ্র বর্মন। তিনি জানালেন চোখের সামনে এতগুলো মানূষকে ডুবে যেতে দেখে এখনো গা কাপছে তার । শেষমুহুর্তে একে অন্যকে জড়িয়ে বাঁচার আকুতি আর গগণবিদারী চিৎকার এখনো কানে বাজছে। এতগুলো প্রাণ বিসর্জনের পর দেবী দুর্গাকে তারা কিভাবে বিসর্জন দিবেন তা জানেন না তিনি ।

নৌকাডুবিতে চারদিনের অভিযানে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৬৮ জনের মরদেহ। নিখোঁজের তালিকায় থাকা ৪ জনকে এখনো পাওয়া যায়নি। তাদের খূঁজে পেতে করতোয়া তীরে স্বজনরা ছুটছেন। তাদের কান্না আর রোনাজারীতে শোকে স্তব্ধ নদীর দুই পাড়।

ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রী ছিলেন বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী এলাকার হিমালয় ও তার স্ত্রী। তার স্ত্রী কোনভাবে বেঁচে ফিরলেও চারদিনেও তার সন্ধান মেলেনি। তাকে খুঁজতে নদীপাড়ে বোন নীতি রানীর কান্না কাঁদিয়েছে সবাইকে। তিনি বলেন, 'আমি আজ ভাইকে না নিয়ে যাবোনা,আমার ভাই কই তাকে ছাড়া আমি আজ যাবোনা'।

শোকে ঢাকা করতোয়ার পাড়ে ভীড় করছেন আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থেকে আসা নুরুল হক জানালেন এ দূর্ঘটনা আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। শোকার্ত মানুষগুলোর সাথে দেখা করার জন্য আসছি। তাদের কান্না দেখে চোখের পানি আটকানো যাচ্ছেনা ।

এর আগে কয়েকবার ঘটনাস্থলে আসেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। তিনি জানান, এরকম বড় কোন দূর্ঘটনার সাক্ষী পঞ্চগড়বাসী। তবে নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং নদীতে বেশি পানি থাকায় এ ঘটনা ঘটেছে । এ ঘটনায় কারো অবহেলা থাকলে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

এছাড়া ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান, ঠাকুরগাঁওয়ের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন, দিনাজপুরের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে আসেন। এসময় তারা নিহতের পরিবারের সদস্যদের স্বান্তনা জানানোর পাশাপাশি সবাইকে তাদের পাশে দাড়ানোর অনুরোধ জানান।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রাণতোষ আচার্য শিবু বলেন, 'মৃত্যুই একমাত্র নিয়তি কিন্তু এমন মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে বেদনাসিক্ত করে। নৌ-দুর্ঘটনায় পঞ্চগড়বাসীর সাথে আমরা সারা দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শোকার্ত। এমনকি সারা দেশের মানুষ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে'।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে এবং এবারের পুজোয় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।


বাংলাদেশ গ্লোবাল/এমএফ

সবশেষ খবর এবং আপডেট জানার জন্য চোখ রাখুন বাংলাদেশ গ্লোবাল ডট কম-এ। ব্রেকিং নিউজ এবং দিনের আলোচিত সংবাদ জানতে লগ ইন করুন: www.bangladeshglobal.com

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন