আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়ার আকাশজুড়ে উৎসবের আমেজ। আগামী ৩১ আগস্ট দেশটি উদযাপন করবে ৬৮তম স্বাধীনতা দিবস বা হারি মেরদেকা। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত রঙিন পতাকা, আলোকসজ্জা আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ।
কুয়ালালামপুরের এক দোকানদার, ৬৫ বছর বয়সী হাজি সালেহ, যিনি স্বাধীনতার প্রথম দিনটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, “আমি তখন শিশু। মনে আছে, লোকজন চিৎকার করে ‘মেরদেকা, মেরদেকা’ বলছিল। আজও সেই দিনের উত্তেজনা শরীর কাঁপিয়ে তোলে। স্বাধীনতার মানে শুধু বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নয়, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার।”
পুত্রজায়ায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সিতি নুরাইশা মনে করেন, স্বাধীনতা দিবস নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। তিনি বলেন, “আমাদের জন্য মেরদেকা মানে আধুনিক প্রযুক্তি, সমান সুযোগ আর বিশ্বে শক্তিশালী মালয়েশিয়া। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে।”
এবারের মেরদেকা দিবসের প্রতিপাদ্য— “Malaysia MADANI: সেপাকত, বেরশামা, বারসামা”। দেশটির সরকারের মতে, এই থিমের লক্ষ্য হলো জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা।
দেশটির দাতারান পুত্রজায়াতে হবে প্রধান অনুষ্ঠান। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, শিশু-কিশোরদের পরিবেশনা এবং ঐতিহাসিক দৃশ্যপটের নাট্যরূপ দর্শকদের ফিরিয়ে নেবে ১৯৫৭ সালের সেই দিনটিতে। জাতীয় সংস্কৃতি ও শিল্পকলা বিভাগের (জেকেকেএন) মহাপরিচালক মোহাম্মদ আমরান মোহাম্মদ হারিস বলেন, প্রস্তুতির সমন্বয় সাধনের জন্য একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চলাচল এবং মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিমের আগমন অন্তর্ভুক্ত। বৃহস্পতিবার দাতারান পুত্রজায়ায় সাক্ষাৎকালে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়গুলো মোকাবেলা করার সময় জাতীয় দিবসের কর্মসূচি কমিটির সামনে এটি একটি চ্যালেঞ্জ।’
২০২৫ সালের জাতীয় দিবস উদযাপন আগামী রোববার সকাল ৭টা থেকে দেশের নেতা এবং সুলতান ইব্রাহিমের আগমনের মাধ্যমে শুরু হবে। রয়েল মালয়েশিয়ান নৌবাহিনীর কর্মীদের দ্বারা জালুর গেমিল্যাং উত্তোলন, রুকুন নেগারা অঙ্গীকার পাঠ এবং বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণকারীদের অংশগ্রহণে একটি কুচকাওয়াজের মাধ্যমে উদযাপন শুরু হবে।
এই বছরের মূল কুচকাওয়াজে মোট ১৪ হাজার ১০ জন অংশগ্রহণকারী, ৭৮টি যানবাহন, সাতটি সুসজ্জিত ভাসমান নৌকা, ১১৬টি প্রাণী এবং ২১টি মার্চিং ব্যান্ড অংশগ্রহণ করবে। এবারের আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে আসিয়ান চেয়ারম্যানশিপ এবং ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬ সহ সাতটি সংস্থার অংশগ্রহণে একটি ফ্লোট প্যারেড। সেই সঙ্গে ১৩০ জন ব্যাগপাইপ সঙ্গীত শিল্পীর অংশগ্রহণে মালয়েশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর একটি বিশেষ পরিবেশনা।
শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট অনুষ্ঠানও সমান আকর্ষণীয়। রাজধানীর বুকিত বিনতাংয়ে কর্মরত রিকশা চালক আমিরুল বলেন, “সারা বছর কষ্ট করি। কিন্তু স্বাধীনতা দিবস এলে মনে হয় আমরা সবাই এক পরিবার। সেদিন রাস্তায় কাজ করি, কিন্তু আতশবাজি দেখে বুক ভরে যায়।”
দেশের বাইরে থাকা মালয়েশীয় প্রবাসীরাও এদিন ভুলে থাকেন না। তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পতাকা উত্তোলন আর মিলনমেলার মাধ্যমে স্বাধীনতার আনন্দ ভাগ করে নেন। এক প্রবাসী শিক্ষার্থী জানালেন, “দেশ থেকে দূরে থাকলেও মেরদেকার গান শুনলে বুক ভরে ওঠে। তখন মনে হয়, আমি কুয়ালালামপুরেই আছি।”
১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়া মুসলিম দেশ ছিল মালয়েশিয়া। সেই থেকে দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় আসা শুরু করেন। বর্তমানে শ্রম, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সামরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রয়েছে দুই দেশের মধ্যে।
সবশেষ খবর এবং আপডেট জানার জন্য চোখ রাখুন বাংলাদেশ গ্লোবাল ডট কম-এ। ব্রেকিং নিউজ এবং দিনের আলোচিত সংবাদ জানতে লগ ইন করুন: www.bangladeshglobal.com