ঢাকা      সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শিরোনাম

গরু কোরবানিতে শুভেন্দুর ফাঁদে পা দিলেন না মুসলমানরা, কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় ধস

IMG
25 May 2026, 1:39 PM

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, কলকাতা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের গরু কোরবানি বন্ধ করার নিষেধাজ্ঞা জারি করে মুসলিমদের জব্দ করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ধস। এটা করতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কার্যত গো-পালক ও গরু বিক্রেতা হিন্দু সমাজের পেটে লাথিই মারলেন! হিন্দু গো-পাল ও গরু বিক্রেতাদের পেটেই লাথি মারলেন তিনি।

মুসলমানরা অশান্তি এড়াতে গরুর পরিবর্তে ছাগল, খাসি, ভেড়া বা উটকে কোরবানি করার জন্য বেছে নিয়েছেন বিকল্প হিসাবে। কোনো জটিলতায় জড়াতে চাননি। এতে হিন্দু গরু বিক্রেতাদের মাথায় হাত। তারাই এখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে রাস্তায়। এছাড়া কলকাতা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন তারা।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার এশিয়ার বৃহত্তম গরুর হাট জেলার বেলডাঙাতে অবস্থিত। সেই হাটে‌ কোনো গরু বিক্রি হচ্ছে না। হিন্দু মা-বোন-ভাইদের‌ কাছে একমাত্র সম্বল চোখের পানি। তারা আজ‌ শুভেন্দুর বিরুদ্ধে রাস্তায়। বেলডাঙার মতো ছোটো-বড়-মাঝারি হাটের সংখ্যা ১০০০ খানেক। এই হাটগুলি এখন কার্যত ফাঁকা।

১৯৫০ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার পশু বলিদান আইন তৈরি করেছিল কৃষি কার্যের সহায়ক‌ গরুর সংখ্যা যাতে কমে না যায়। পাশাপাশি গরু দুধ সরবরাহ ও যোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। একটা নিয়ন্ত্রণ রেখা ও রীতিনীতি করতে‌ তখন বাধ্য হয়েছিল ভারত সরকার। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও। কিন্তু এখন তো কৃষিকাজ ট্রাক্টরের সাহায্যে হচ্ছে । এখন তো মাদার ডেইরি তৈরি করে বিকল্প‌ হিসাবে দুধের যোগান দেওয়া হচ্ছে। তাই ১৯৫০ সালের আইন অনেকটাই‌ শিথিল হয়ে যায়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, সাধারণ হিন্দুদের পেটে লাথি মেরে মাংস সরবরাহকারী ভারতের বৃহত্তম কর্পোরেট হাউসগুলির হাতে গরুগুলোকে তুলে দিতে চান শুভেন্দু অধিকারী ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই মাংস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির মালিক হিন্দু। অর্থাৎ বিজেপি কর্পোরেট হিন্দুদের স্বার্থকে রক্ষা করতে চায় গরীব হিন্দু গো-পালক ও গরু বিক্রেতাদের পেটে লাথি মেরেছে। আর বিদেশি পয়সা কামাতে চায় তারা।

কলকাতার বুকে গড়ে উঠা উপমহাদেশের বৃহত্তম চর্মনগরী বানতলাকে কি নরেন্দ্র মোদি ও শুভেন্দু অধিকারী আদানি-আম্বানিদের হাতে তুলে দিতে চান? এটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার কসাইখানা থেকে গরুর মাংসের কাঁচামাল দিয়ে এলোপ্যাথিক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ওষুধ তৈরি হয়। সেগুলো কি বন্ধ হয়ে যাবে ?চামড়ার ব্যাগের কারখানা, জুতো কারখানা ও চপ্পল কারখানা কি বন্ধ হয়ে যাবে? গরুর চামড়ার সঙ্গে যুক্ত আনুষঙ্গিক শিল্প ও ব্যবসাগুলি কি আজ বন্ধ হয়ে যাবে? বিশেষজ্ঞ মহল আজ এই প্রশ্নই তুলেছেন।

শুভেন্দু অধিকারী যখন তৃণমূলের মন্ত্রী ও নেতা ছিলেন, তখন মুসলমানদের বাড়িতে গিয়ে গরুর মাংস খেয়েছেন যা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। অথচ আজ বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষী নীতিকে কার্যকর করতে ও‌ হিন্দু ভোটকে মেরুকরণ করতে এই অনমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছেন। যাতে মুসলমানরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে একটি দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গে লাগলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আরো সাফল্যমণ্ডিত হবে। এটাই বিজেপি-অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদি-শুভেন্দু অধিকারীর মূল টার্গেট বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। কিন্তু সমাজ বিজেপির সেই ফাঁদে মোটেই পা দেননি।

মুসলমানদের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে কত টাকার ব্যবসা হয়?? গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানদের সম্ভাব্য শতাংশ কতো? এটাও দেখে নেওয়া যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) উপলক্ষে পশুর হাটে আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ কোটি টাকার অর্থনীতি বা লেনদেন হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্যবসার প্রায় ৮০ শতাংশ গবাদি পশু উৎপাদনকারী এবং বিক্রেতা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ (যাঁরা মূলত গ্রামীণ এলাকার ডেইরি খামারি বা গোয়ালা গোষ্ঠীর), আর এর সিংহভাগ ক্রেতা হলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

এই বিশাল অর্থনীতির বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১) অর্থনৈতিক লেনদেন এবং আকার:

মোট লেনদেন: বিভিন্ন হিসাব ও বাজারের অনুমান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসবে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি গরু, খাসি ও অন্যান্য পশু কেনাবেচা হয়। একে কেন্দ্র করে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ১০০ বিলিয়ন রুপি) একটি অস্থায়ী গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরি হয়।

পশুর দাম: জাত, আকার এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি পশুর দাম ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২-৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সম্পর্কিত খাত: শুধু পশু কেনাবেচা নয়, এর সাথে গো-খাদ্য, পরিবহন, এবং চামড়া শিল্প জড়িত, যা বহু গ্রামীণ পরিবারের সারা বছরের আয়ের প্রধান উৎস।

২) ব্যবসায়ী ও খামারিদের মধ্যে অনুপাত:

হিন্দু সম্প্রদায়: গবাদি পশু লালন-পালন ও বিক্রির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের। বিশেষ করে ঘোষ (গোয়ালা) এবং অন্যান্য প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো সারা বছর গরু পালন করে এই মৌসুমের জন্য প্রস্তুত থাকেন।

মুসলিম সম্প্রদায়: পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে মৌসুমি বেপারী বা দালাল হিসেবে অনেকে যুক্ত থাকেন এবং মূল ক্রেতা হিসেবে মুসলিমরাই সর্বাধিক পশু কোরবানি করে থাকেন।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশু জবাই এবং কেনাবেচার নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ করায় কোরবানির বাজারে সামগ্রিকভাবে এক গভীর সংকট ও ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দিয়েছে।

ভারতের বিজেপি সরকারের নতুন আইনে পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির গরু সংকট

১৮ মে ২০২৬ — পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের নতুন পশু জবাই নির্দেশিকায় ঈদুল আজহার আগে গরু কেনাবেচায় তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। মুসলিম ক্রেতাদের অনীহা, খামারিদের আর্থিক ক্ষতি।

লেখক: একজন কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি

ব্রেকিং নিউজ, এই মুহূর্তের খবর, প্রতিদিনের সর্বশেষ খবর, লেটেস্ট নিউজ এবং গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিউজ পেতে ভিজিট করুন www.bangladeshglobal.com

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন